Ticker

6/recent/ticker-posts

Ad Code

নারীকে উত্ত্যক্ত বা নিপীড়নের জন্য বাংলাদেশের আইনে যেসব শাস্তির কথা বলা হয়েছে

বাংলাদেশে নারী নিপীড়ন: আইন শক্তিশালী হলেও বিচার প্রাপ্তি এখনো চ্যালেঞ্জের মুখে

নারী নিপীড়ন একটি গুরুতর অপরাধ, যা আইন অনুযায়ী দণ্ডনীয়। জনসমাগমপূর্ণ স্থানে কিংবা একা চলার পথে কোনো নারীকে উত্ত্যক্ত করা বা হয়রানি করা শুধুমাত্র একটি অনৈতিক কাজ নয়, বরং এটি অনেক ক্ষেত্রে যৌন হয়রানির পর্যায়ে পড়ে।


সম্প্রতি বাংলাদেশে একের পর এক নারী নির্যাতনের ঘটনা জনসচেতনতা ও প্রতিবাদের ঢেউ তুলেছে। উদাহরণ হিসেবে, লালমাটিয়ায় চায়ের দোকানে সিগারেট খাওয়াকে কেন্দ্র করে দুই নারীকে লাঞ্ছিত করার ঘটনা কিংবা মাগুরায় মাত্র আট বছর বয়সী শিশুকে যৌন নির্যাতনের ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। এমন ঘটনা বারবার প্রমাণ করে যে, নারী নির্যাতন সমাজের গভীরে শেকড় গেড়ে বসেছে।


আইনের চোখে নারী নির্যাতন


বাংলাদেশে নারী নির্যাতন ও হয়রানি প্রতিরোধে বেশ কিছু কঠোর আইন বিদ্যমান। হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী, ইভ টিজিং (উত্যক্ত করা) একটি গুরুতর যৌন নির্যাতন হিসেবে গণ্য হবে। আইনজীবীদের মতে, ধর্ষণ, ইভ টিজিং বা হয়রানির মতো অপরাধের জন্য সুনির্দিষ্ট শাস্তির বিধান রয়েছে।


তবে বাস্তবতায়, আইনের শক্তি থাকা সত্ত্বেও অনেক ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এর অন্যতম কারণ হলো, সংজ্ঞার ভুল ব্যাখ্যা ও আইনের অপব্যবহার।


আইনের ফাঁকফোকর ও বাস্তবতা


সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সৈয়দা নাসরিন বলেন, বাংলাদেশের ধর্ষণ সংজ্ঞায় ত্রুটি রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রেমের প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণামূলক সম্পর্ককেও ধর্ষণের সংজ্ঞার আওতায় ফেলা হয়। এতে করে প্রকৃত ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধের গুরুত্ব অনেক সময় কমে যায়।


নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ অনুসারে, নারীর শ্লীলতাহানি বা যৌন পীড়নের দণ্ড হিসেবে সর্বোচ্চ দশ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। এছাড়া, দণ্ডবিধি বা পেনাল কোডসহ অন্যান্য বিভিন্ন আইনে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।


নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে শক্তিশালী অবস্থান প্রয়োজন


আইন থাকলেই যথেষ্ট নয়, তার যথাযথ প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে। আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গাফিলতি ও দীর্ঘসূত্রিতা নারী নির্যাতনের মতো অপরাধকে আরও উৎসাহিত করে। তাই, শুধু আইনগত দিক থেকে নয়, সামাজিক সচেতনতা, দ্রুত বিচার এবং আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করাও জরুরি।


নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা এবং ভুক্তভোগীদের জন্য দ্রুত বিচার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারলেই কেবল এই অপরাধ প্রতিরোধ করা সম্ভব। নইলে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্দোলন ও প্রতিবাদ চলতে থাকবে, কিন্তু অপরাধীরা থেকে যা

বে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।

নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর আইন থাকলেও প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন


আইনজীবীদের মতে, নারী নির্যাতন ও যৌন হয়রানির মাত্রাভেদে বিভিন্ন আইনের আওতায় বিচার হয়। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের একটি ধারায় যৌন নিপীড়নের সংজ্ঞা স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং এর জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।


আইনে বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি অবৈধভাবে তার যৌন কামনা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে কোনো নারী বা শিশুর যৌন অঙ্গ বা অন্য কোনো অঙ্গ স্পর্শ করে বা শ্লীলতাহানি করে, তবে তা যৌন পীড়ন হিসেবে গণ্য হবে। এই অপরাধের জন্য ন্যূনতম তিন বছর এবং সর্বোচ্চ ১০ বছর সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে, পাশাপাশি অর্থদণ্ডও দিতে হবে।


ইভ টিজিং, অশ্লীল আচরণ ও শাস্তির বিধান


আইনজীবীরা আরও জানান, যদি কেউ প্রকাশ্য স্থানে অন্যদের বিরক্ত করে, অশ্লীল গান গায়, আবৃত্তি করে বা অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করে, তবে সেটিও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।


বাংলাদেশ দণ্ডবিধির একটি ধারায় বলা হয়েছে, অন্যদের বিরক্ত করা বা অশ্লীল আচরণ করলে দোষী ব্যক্তিকে তিন মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে।


আরেকটি ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি কোনো নারীর শ্লীলতাহানির উদ্দেশ্যে কথা বলে, অঙ্গভঙ্গি করে বা অন্য কোনো অসদাচরণ করে, তবে এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দেওয়া হতে পারে।


তবে, এই ধারাগুলোর কার্যকর প্রয়োগ এখনো যথেষ্ট দুর্বল বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সৈয়দা নাসরিন। তিনি বলেন, "আইনজীবী হিসেবে আমার ১২ বছরের অভিজ্ঞতায় আমি কখনো এই ধারাগুলোর প্রয়োগ হতে দেখিনি। বরং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মেয়েদের ওপর দোষ চাপানো হয়।"


ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশে নারীকে অপমান বা উত্ত্যক্ত করার শাস্তি


ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশেও ইভ টিজিং বা নারীদের উত্ত্যক্ত করার বিষয়ে শাস্তির বিধান রয়েছে।


আইনে বলা হয়েছে, "যদি কেউ রাস্তায় বা পাবলিক প্লেসে স্বেচ্ছায় ও অশালীনভাবে নিজের শরীর প্রদর্শন করে, যা কোনো বাড়ি বা ভবন থেকে কোনো নারী দেখতে পারে, অথবা কোনো নারীকে অপমান, বিরক্ত বা তার পথ রোধ করে, তবে সেটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।"


এছাড়া, "যদি কেউ কোনো রাস্তায় বা প্রকাশ্য স্থানে অশালীন ভাষা ব্যবহার করে, অশ্লীল আওয়াজ, অঙ্গভঙ্গি বা মন্তব্য করে কোনো নারীকে অপমান বা বিরক্ত করে, তবে এক বছরের কারাদণ্ড, দুই হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে হবে।"


এই অধ্যাদেশের অন্য একটি ধারায় বলা হয়েছে, সমাজে অশালীন বা উচ্ছৃঙ্খল আচরণের জন্য তিন মাসের কারাদণ্ড বা ৫০০ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে।


ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক বিচার


আইনজীবীরা জানান, ভ্রাম্যমাণ আদালত আইনের অধীনে, ম্যাজিস্ট্রেট কোনো অপরাধ প্রকাশ্যে ঘটতে দেখলে তাৎক্ষণিকভাবে শাস্তি দিতে পারেন। এই আইনে সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড দেওয়ার বিধান রয়েছে।


আইন কঠোর, তবে প্রয়োগ দুর্বল

নারী নির্যাতন ও যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে বাংলাদেশে অনেক কঠোর আইন থাকলেও, এসব আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত না হওয়ায় ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার পান না।


আইনজীবীদের মতে, আইন যতই কঠোর হোক, যদি তা বাস্তবে কার্যকর না হয়, তবে অপরাধীরা পার পেয়ে যাবে এবং নারীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে। তাই, শুধুমাত্র আইন প্রণয়ন নয়, তার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

ইভ টিজিং: আইনগত পদক্ষেপ ও আইনি পরামর্শ


আইনজীবীরা জানান, ইভ টিজিং এর শিকার হলে অবশ্যই আইনের আশ্রয় নিতে হবে। আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার মাধ্যমে এই ঘটনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা এবং আইনি প্রতিকার চাওয়া সম্ভব।


আইনজীবীদের পরামর্শ অনুযায়ী, ইভ টিজিংয়ের শিকার হলে প্রথমে নিকটস্থ থানায় দ্রুত অভিযোগ জানানো উচিত, এবং লিখিত অভিযোগও করা যাবে। এমনকি, পুলিশ নিজে বাদী হয়ে মামলা করতে পারে। যদি থানায় অভিযোগ না নেওয়া হয়, তবে সরাসরি আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার সুযোগ রয়েছে।


ভ্রাম্যমাণ আদালত ও তাৎক্ষণিক শাস্তি


আইনজীবীরা আরও বলেন, যদি কেউ ইভ টিজিংয়ের শিকার হয় বা এমন কোনো ঘটনা দেখেন, তবে ভ্রাম্যমাণ আদালতকে অবহিত করা উচিত। যদি ভ্রাম্যমাণ আদালত ঘটনার প্রমাণ পায়, তবে ঘটনাস্থলেই তাৎক্ষণিকভাবে শাস্তি দেওয়া যেতে পারে। তবে, এমন কোনো চেষ্টা যেন না করা হয় যাতে নিরীহ কাউকে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়, কারণ এতে উল্টো ফলাফল হতে পারে।


সংবিধান এবং নারী-পুরুষের সমান অধিকার


বাংলাদেশের সংবিধানে নারী ও পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। তাই, নারীর প্রতি বিদ্বেষমূলক কোনো বক্তব্য প্রদান করলে তা সংবিধানের লঙ্ঘন বলে বিবেচিত হবে।


আইনজীবী মিজ নাসরিন বলেন, "সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কোনো স্ট্যাটিউটরি আইন তৈরি করা উচিত, যাতে এই অপরাধের শাস্তি আরও কঠোরভাবে নির্ধারণ করা যায়।"


অপরাধ এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি


সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফওজিয়া করিম মনে করেন, "অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতি" মূলত ইভ টিজিংসহ অন্যান্য অপরাধকে প্রভাবিত করে। তিনি আরও বলেন, "অপরাধ ঢাকার জন্য অর্থ এবং রাজনীতির ব্যবহার সমাজে অপরাধীকে পার পেয়ে যাওয়ার এক ধরনের মনোভাব সৃষ্টি করে।"


আইন সংশোধনের জন্য বৈঠক


মঙ্গলবার আইন মন্ত্রণালয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধনের জন্য একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে আইনে বেশ কিছু সংশোধনী আনা হতে পারে, যার মধ্যে অন্যতম হলো অভিযুক্ত ব্যক্তি আটক হওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করা এবং অভিযুক্ত যদি ধরা না পড়েন, তবে ৩০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করার নিয়ম রাখা।


আইনজীবী মিজ করিম জানান, এধরনের সংশোধনী আইনটি দ্রুত কার্যকর করা হবে, যাতে আইনপ্রয়োগ আরও শক্তিশালী এবং দ্রুত হয়।





একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ